Ticker

6/recent/ticker-posts

মেঘলা আকাশ, ঘনঘটায় দর্শকের ঢল



শ্রাবণের মেঘলা আকাশ আর খোলা হাওয়ার আবহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বিশেষ নৃত্য উৎসব ‘ঘনঘটা ২’। অর্থী আহমেদ ড্যান্স একাডেমি ও চারুকলা অনুষদের যৌথ প্রযোজনায় শুক্রবার সকালে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। বর্ষা উদ্‌যাপনের এই আয়োজনে যেমন ছিল নৃত্যের ছন্দ, তেমনই ছিল সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক মানবিক উদ্যোগ।

​৩ থেকে ৭০ বছরের ৩০০ শিল্পীর মেলবন্ধন

​এই নৃত্য উৎসবের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এর শিল্পীদের বৈচিত্র্য। ৩ বছর বয়সী শিশু থেকে শুরু করে ৭০ বছরের প্রবীণ—সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ জন অপেশাদার শিল্পী এই উন্মুক্ত মঞ্চে নৃত্য পরিবেশন করেন। উৎসবের মঞ্চে পা মেলানো এই শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন শিশুসহ চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সাংবাদিক, গবেষক ও গৃহিণীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ।

​আয়োজক ও বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী অর্থী আহমেদ (যিনি নৃত্যে অবদানের জন্য ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি একুশে পদক লাভ করেছেন) উৎসবের মূল ভাবনা নিয়ে বলেন:

​"‘ঘনঘটা’ শুধু একটি নৃত্য প্রযোজনা নয়, বরং এটি নতুন করে শুরু করার উৎসব। যেখানে বয়স কোনো বাধা নয়, আর মনের ভেতরে চেপে রাখা স্বপ্নকে ডানা মেলতে দেওয়া হয়।"

​মেঘলা সকালে ১৬ গানের ঝংকার

​আকাশে মেঘের ঘনঘটা থাকলেও কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি নামেনি, তবে বকুলতলার চত্বর ভেসেছে গানের সুর আর নাচের তালে। নীল-সাদা পোশাকে শিল্পীরা ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’ গানের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা করেন। এ সময় উপস্থিত দর্শকেরা করতালি দিয়ে শিল্পীদের অভিবাদন জানান। এরপর একে একে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত ও লোকসংগীতসহ মোট ১৬টি গানের সাথে নাচ পরিবেশিত হয়।

​পরিবেশিত উল্লেখযোগ্য কিছু গান:

​আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে

​পাগলা হাওয়ার বাদল-দিনে

​এসো শ্যামল সুন্দর

​রুম্ ঝুম্

​মোর ভাবনারে কী হাওয়ায় মাতালো

​হৃদয়গ্রাহী এই পুরো পরিবেশনাটি শেষ হয় ‘আমরা সবাই রাজা’ গানের সমবেত নৃত্যের মাধ্যমে।

​বকুলতলায় মানুষের ঢল

​উৎসবকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই চারুকলায় ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। দর্শকদের পরনে ছিল বর্ষার আবহ ছড়ানো সাদা, সবুজ ও নীল রঙের শাড়ি ও পাঞ্জাবি। সকাল থেকেই বকুলতলার সামনে ছিল লোকে লোকারণ্য। বসার জায়গা না পেয়ে বহু দর্শক দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন, এমনকি ঠাসা ভিড়ের কারণে অনেকে ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি।

​দর্শকসারিতে তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি মধ্যবয়সী ও প্রবীণদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, যার মধ্যে নারীর সংখ্যাই ছিল বেশি। বনানী থেকে সপরিবারে আসা ফারিহা আলম নামের এক দর্শক অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, "আমি নিজেও নাচ শিখছি। খোলা আকাশের নিচে এমন চমৎকার আয়োজন দেখে আমি সত্যিই মুগ্ধ।"

​বন্যার্তদের সহায়তায় তহবিল সংগ্রহ

​এবারের ‘ঘনঘটা ২’ উৎসবটি কেবল আনন্দ-উদ্‌যাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এর সাথে যুক্ত হয়েছিল সামাজিক দায়বদ্ধতা। সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তার জন্য উৎসব প্রাঙ্গণে ‘জাগো ফাউন্ডেশন’-এর একটি বিশেষ বুথ স্থাপন করা হয়, যেখানে দর্শকেরা তাঁদের সামর্থ্য অনুযায়ী অনুদান জমা দেন।

​অনুষ্ঠান শেষে অর্থী আহমেদ দর্শকদের উদ্দেশ্যে মানবিক আহ্বান জানিয়ে বলেন, "আমাদের আয়োজন ভালো লেগে থাকলে আপনাদের সামর্থ্য অনুযায়ী ডোনেট করবেন প্লিজ। আপনাদের প্রতিটি অবদান একটি অর্থপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। এখান থেকে আমরা যদি ভালো কোনো কনট্রিবিউশন দিতে না পারি, তবে এই উৎসবের কোনো মানেই থাকবে না।"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ