যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার সংক্রান্ত কেলেঙ্কারিতে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা যখন টালমাটাল, ঠিক সেই সময়েই নিজের অটুট জনপ্রিয়তার প্রমাণ দিলেন বর্তমান সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। সব বিতর্ককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে টানা চতুর্থ মেয়াদে ফিফা প্রধান হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হতে ২০০টিরও বেশি দেশের আনুষ্ঠানিক সমর্থন পেয়েছেন তিনি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে 'বালোগান কেলেঙ্কারি'
২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে সরাসরি লাল কার্ড দেখেছিলেন মার্কিন ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগান। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী এই লাল কার্ডের শাস্তি হিসেবে পরবর্তী ম্যাচে তার নিষেধাজ্ঞা ছিল সম্পূর্ণ ‘স্বয়ংক্রিয়’ এবং এর বিরুদ্ধে আপিল করার কোনো সুযোগ ছিল না।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই বালোগানের লাল কার্ড পুনর্বিবেচনার জন্য ফিফা প্রধান ইনফান্তিনোকে ফোন করার কথা স্বীকার করেন। এরপরই অভূতপূর্ব এক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি এক বছরের প্রবেশনাল পিরিয়ড দেখিয়ে বালোগানের শাস্তি স্থগিত করে, যার ফলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে নকআউট পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মাঠে নামার সুযোগ পান তিনি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (উয়েফা) ও বেলজিয়াম ফুটবল ফেডারেশন ফিফার তীব্র সমালোচনা করে এবং ফুটবল বিশ্বের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে। হিউম্যান রাইটস সংস্থা 'ফেয়ারস্কয়ার' (FairSquare) এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (IOC) কাছে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও দায়ের করে।
পাহাড়সম সমর্থন ইনফান্তিনোর পক্ষে
এত বড় বিতর্কের পরও ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের মধ্যে ২০০টিরও বেশি অ্যাসোসিয়েশন ইতিমধ্যেই ইনফান্তিনোর পক্ষে তাদের আনুষ্ঠানিক সমর্থনপত্র পাঠিয়ে দিয়েছে। ফলে আগামী বছর (২০২৭) অনুষ্ঠিতব্য ফিফা কংগ্রেসে তার চতুর্থ মেয়াদে জয়ী হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
একমাত্র প্রার্থী: নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামী ১৮ নভেম্বর। এখন পর্যন্ত ইনফান্তিনো ছাড়া অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সামনে আসেনি।
ইউরোপের বড় অংশের সমর্থন: বালোগান কেলেঙ্কারি নিয়ে অসন্তোষ মূলত ইউরোপীয় ফুটবল মহলে সীমাবদ্ধ থাকলেও, ইউরোপের অধিকাংশ দেশই ইনফান্তিনোকে সমর্থন দিয়েছে। এমনকি ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (FA) বিশ্বকাপ শুরুর আগেই তাদের সমর্থনপত্র পাঠিয়ে দিয়েছিল।
ব্যতিক্রম জার্মানি: এখনও যে সামান্য কয়েকটি দেশ সমর্থনপত্র পাঠায়নি, তার মধ্যে জার্মানির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (DFB) অন্যতম, যারা এখনও ইনফান্তিনোর পক্ষে আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়নি।
নেপথ্যে কি তবে প্রচ্ছন্ন চাপ?
সব দেশ সমর্থন দিলেও এর পেছনে ফিফার অভ্যন্তরীণ চাপ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একাধিক জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, ফিফার ভেতর থেকে তাদের আনুগত্য নিশ্চিত করার জন্য এবং দ্রুত সমর্থনপত্র পাঠানোর জন্য এক ধরণের ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে, যা তাত্ত্বিকভাবে ফিফার নৈতিক বিধিমালা বা ‘এথিক্স কোড’-এর পরিপন্থী।
পর্দার আড়ালে ইউরোপের কয়েকটি দেশ উয়েফার অধীনে ইনফান্তিনোর বিপক্ষে বিকল্প কোনো প্রার্থী দাঁড় করানোর চেষ্টা করলেও, সব ফেডারেশন মিলে একক কোনো নামের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। বিশ্লেষকদের মতে, ইনফান্তিনোকে ক্ষমতা থেকে সরাতে এখন বড় ধরণের কোনো ‘রাজনৈতিক ভূমিকম্পের’ প্রয়োজন, যা আপাতত দূর দিগন্তেও দেখা যাচ্ছে না।

0 মন্তব্যসমূহ