বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা:
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলাগুলোর তদন্তে একের পর এক চাঞ্চল্যকর ও নজিরবিহীন অসঙ্গতি বেরিয়ে আসছে। পুলিশের দাখিল করা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কোনো মামলার ‘নিহত’ ব্যক্তি খোদ জীবিত অবস্থায় বিদেশে কর্মরত আছেন, আবার কোনো মামলার বাদীরই কোনো বাস্তব অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক শত্রুতার জেরে সম্পূর্ণ নিরীহ মানুষদের এসকল মামলায় আসামি করার প্রমাণ পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থা।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই ভয়াবহ জালিয়াতির চিত্র সামনে এসেছে।
‘মৃত’ বাবু এখন সৌদি আরবের শ্রমিক!
সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর হাতিরঝিল থানার একটি হত্যা মামলায়। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে মো. বাবু (৪৬) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন দাবি করে আদালতে মামলা করা হয়েছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ নেতাদের আসামি করা এই মামলার তদন্তে নেমে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসে।
তদন্ত কর্মকর্তা এজাহারে দেওয়া জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ধরে চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার বরুরকান্দি গ্রামে গিয়ে জানতে পারেন, 'নিহত' বাবু আসলে জীবিত এবং তার আসল নাম মো. শাকিল। তিনি বর্তমানে সৌদি আরবে কর্মরত। গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে শাকিল বলেন:
"আমি তো মারা যাইনি ভাই। আমি মরলে সৌদি আরব আসলাম কীভাবে? এখন আমি সৌদি আরবে শ্রমিক হিসেবে কাজ করি।"
শুধু তাই নয়, মামলার বাদী হিসেবে যার নাম রয়েছে (ইসমাইল, শাকিলের খালাতো ভাই পরিচয় দেওয়া), তদন্তে জানা যায় তিনি এই মামলা সম্পর্কে কিছুই জানেন না। আদালতে হাজির হয়ে ইসমাইল জবানবন্দি দিয়েছেন যে, তার নাম-পরিচয় ব্যবহার করে অন্য কেউ জালিয়াতির মাধ্যমে এই ভুয়া মামলাটি দায়ের করেছে। মামলার সঙ্গে সংযুক্ত মৃত্যুসনদটিও জাল বলে প্রমাণিত হয়েছে।
পুরনো কাটাছেঁড়ার দাগকে 'গুলিবিদ্ধ' দাবি!
অন্য একটি জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে পল্টন থানার মামলায়। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই পারভেজ আলী নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন এবং বাদী ইয়াসিন আরাফাত নিজে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন দাবি করে মামলাটি করা হয়েছিল।
পিবিআই-এর তদন্তে দেখা যায়, কথিত নিহত পারভেজ আলীর কোনো অস্তিত্বই নেই। আর বাদী ইয়াসিন আরাফাতের শরীরে গুলি লাগার যে দাবি, তা আসলে সম্পূর্ণ ভুয়া। তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই-এর এসআই মো. মাসুদ রানা জানান:
"কোনো একসময় পায়ে আছড় লেগে বা পড়ে গিয়ে কাটা-ছেঁড়ার যে দাগ হয়েছিল, সেটিকেই গুলিবিদ্ধ হওয়ার চিহ্ন হিসেবে দেখিয়ে মামলাটি করা হয়েছিল। এমনকি তার বাবাও এ বিষয়ে কিছু জানতেন না এবং কোনো মেডিকেল সনদও মেলেনি।"
পারিবারিক শত্রুতার জের:
এই মামলায় পাবনার দুই ট্রাকচালক চাচা-ভাতিজাকে আসামি করা হয়েছিল, যারা ঘটনার দিন ঢাকায় ছিলেনই না (যার প্রমাণ তাদের ফোনের সিডিআর রেকর্ডে মিলেছে)। আসামিরা জানান, জমিজমা নিয়ে বিরোধ থাকা প্রতিবেশীর এক আত্মীয়ের সাথে বাদীর বন্ধুত্ব থাকায় সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের এই মামলায় জড়ানো হয়েছে।
লাপাত্তা বাদী ও ভুয়া ঠিকানা
একই ধরনের জালিয়াতি মিলেছে আদাবর থানার অন্য একটি হত্যা মামলায়। সেখানে তোহা খান নামে এক ব্যক্তি বাদী হয়ে আলী মিয়া নামে একজন নিহত হওয়ার দাবি করে মামলা করেছিলেন। কিন্তু পুলিশ তদন্তে গিয়ে দেখে, এজাহারে দেওয়া মোবাইল নম্বরটি বন্ধ এবং ঠিকানায় তোহা খান নামে কোনো ব্যক্তির অস্তিত্বই নেই। ঘটনাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হওয়ায় আদালত এটিকে ‘মিথ্যা মামলা’ হিসেবে গ্রহণ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে।
ঢালাও মামলার পরিসংখ্যান ও বাদীদের শাস্তি নিয়ে প্রশ্ন
ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থানের ঘটনায় রাজধানীর ৫০টি থানায় মোট ৭০৭টি মামলা দায়ের হয়েছিল। এর মধ্যে বর্তমানে ১২৬টি মামলার তদন্ত চলছে। ইতোমধ্যে ১৯টি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৩টি মামলা সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা’ এবং বাকি ১৬টিতে গুরুতর তথ্যগত অসঙ্গতি ও ভুয়া কাগজপত্রের প্রমাণ মিলেছে।
ভুয়া মামলার বাদীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, দণ্ডবিধির ২১১ ধারা অনুযায়ী অন্যের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা মামলা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে এর প্রয়োগ আমাদের দেশে কম। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এ ধরনের ভুয়া মামলার কারণে বিচারকদের মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, যা প্রকৃত শহীদদের মামলার বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, আইন অনুযায়ী ভুয়া বাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং এই ক্ষেত্রেও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।

0 মন্তব্যসমূহ