ঢাকা: দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি কঠিন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এর ভঙ্গুর অবস্থা কাটিয়ে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে আগামী দুই বছর কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্য দিয়ে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হবে এবং এর পরেই ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি।
১২ জুন (শুক্রবার) বিকেলে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যতের রূপরেখা তুলে ধরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করেন:
- ঋণনির্ভরতা থেকে বিনিয়োগনির্ভরতা: অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিকে টেকসই করতে হলে ঋণনির্ভরতার বদলে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির দিকে যেতে হবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি, মূল্যস্ফীতি কমানোসহ সার্বিক অর্থনীতিকে উজ্জীবিত করতে বিনিয়োগই মূল চালিকাশক্তি। ঘোষিত পরিকল্পনার অন্তত ৮০% সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
- অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ: এবারের বাজেটের মূল দর্শন হলো 'অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ'। অতীতে অর্থনৈতিক সুফল সীমিত কয়েকটি গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত ছিল। বর্তমান বাজেট সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কথা বিবেচনা করে প্রণয়ন করা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ এর সুফল পায়।
- মূল্যস্ফীতি ও বাজার নিয়ন্ত্রণ: অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, "বাজার বা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ পুলিশ, র্যাব কিংবা সরকারি লোক দিয়ে পিটিয়ে করার বিষয় না, এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।" এটি সঠিক পলিসি ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এছাড়া ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবেলায় অন্তত ৩ মাসের জ্বালানি ও খাদ্যমজুদ রাখার মতো 'বাফার স্টক' গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
- দক্ষ জনশক্তি ও কর্মসংস্থান: সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য দেশের শ্রমশক্তিকে দক্ষ করে তোলা। এ জন্য মেগা প্রকল্পের চেয়ে মানবসম্পদ উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে, যাতে দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পায়।
- বিনিয়োগ টাস্কফোর্স: বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হবে। নতুন বিনিয়োগ নীতিমালা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করা হবে।
"বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামো ঠিকঠাক করতে অন্তত দুই বছর সময় লেগে যাবে। তৃতীয় বছরে গিয়ে হয়তো অর্থনীতি সামনের দিকে এগোবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে গিয়ে অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াবে।"
— আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থমন্ত্রী।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমিয়ে আনছে এবং বিকল্প হিসেবে 'সুকুক বন্ডের' মতো মাধ্যমকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এছাড়া নতুন করে কালো টাকা সাদা করার কোনো সুযোগ এই বাজেটে রাখা হয়নি, বরং পূর্বের জমি রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত ২০% করের বিধানটিই বহাল রয়েছে।
অর্থ সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদারের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

0 মন্তব্যসমূহ