Ticker

6/recent/ticker-posts

গ্যাস সংকটের ধাক্কা বিদ্যুতে, লোডশেডিং উঠেছে ৯৬২ মেগাওয়াটে


 

মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২৩ কোটি ঘনফুট বা প্রায় ২৫ শতাংশ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সারাদেশে বিদ্যুতের ঘাটতি বৃদ্ধি পেয়ে ২৫ জুলাই রাত ১১টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৯৬২ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে।

​এলএনজি সরবরাহ কমে প্রায় অর্ধেক

​পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের আনুমানিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সাধারণত ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যায়, যার মধ্যে আমদানি করা এলএনজি থেকে আসে ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট।

​তবে মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনালের মধ্যে একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে আমদানি করা এলএনজির দৈনিক সরবরাহ ৯৯ কোটি ৩৫ লাখ ঘনফুট থেকে কমে ৫০ কোটি ১১ লাখ ঘনফুটে নেমে এসেছে। ফলে দেশীয় ও বিদেশি উৎস মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ ২৬৪ কোটি ঘনফুট থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ২১৫ কোটি ঘনফুটে।

​বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস ও উৎপাদন চিত্র

​পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (PGCB) জাতীয় লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী:

  • ​গ্যাস সরবরাহ হ্রাস: ২০ জুলাই যেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৯২ কোটি ৬৮ লাখ ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হচ্ছিল, ২৫ জুলাই তা কমে দাঁড়ায় ৬৯ কোটি ৮৯ লাখ ঘনফুটে। অর্থাৎ গ্যাস সরবরাহ কমেছে প্রায় ২২ কোটি ৭৯ লাখ ঘনফুট (২৪.৬%)।

  • ​বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস: গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক উৎপাদন ১২ কোটি ৫৫ লাখ ইউনিট থেকে কমে ৯ কোটি ৩৯ লাখ ইউনিটে নেমে এসেছে—উৎপাদন কমেছে প্রায় ২৫.২ শতাংশ।

  • ​উৎপাদনে শেয়ার: মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের অবদান ৩৬.৭ শতাংশ থেকে কমে ২৭.৯ শতাংশে নেমেছে।

​সর্বোচ্চ ৯৬২ মেগাওয়াট লোডশেডিং

​বিদ্যুতের এই ঘাটতি মেটাতে কয়লা ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও বিশাল ব্যবধান মেটানো সম্ভব হয়নি।

  • ​২৫ জুলাই রাতে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা উঠেছিল ১৬ হাজার ৩২৭ মেগাওয়াটে, যার বিপরীতে উৎপাদন করা সম্ভব হয় ১৫ হাজার ৩২২ মেগাওয়াট।

  • ​এর ফলে রাত ১১টায় সারাদেশে সর্বোচ্চ ৯৬২ মেগাওয়াট লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়।

  • ​অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং পরিলক্ষিত হয়েছে ময়মনসিংহে (৩৫৩ মেগাওয়াট), এর পরেই রয়েছে সিলেট (২০৭ মেগাওয়াট), ঢাকা (১৬১ মেগাওয়াট) ও খুলনা (১০১ মেগাওয়াট)।

​জনজীবন ও শিল্পে দুর্ভোগ

​গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের যৌথ প্রভাবে কেবল বিদ্যুৎ খাতই নয়, স্থবির হয়ে পড়েছে সাধারণ জনজীবন ও শিল্প উৎপাদন। বাসা-বাড়িতে রান্নার গ্যাসের চাপ না থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ। অনেককে বিকল্প হিসেবে ইণ্ডাকশন বা ইলেকট্রিক চুলার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা আবার বিদ্যুতের বকেয়া বিল ও চাহিদার চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও শিল্পকারখানাতেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

​স্বাভাবিক হতে কত দিন সময় লাগবে?

​বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কারিগরি ত্রুটিতে পড়া এলএনজি টার্মিনালটি দ্রুত মেরামত করার চেষ্টা চলছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে এর আংশিক সরবরাহ (২৮-৩০ কোটি ঘনফুট) শুরু হতে পারে এবং এটি পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে আরও অন্তত এক সপ্তাহ থেকে ১০-১৫ দিন সময় লাগতে পারে। টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু না হওয়া পর্যন্ত এই সাময়িক বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট অব্যাহত থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ